কলেস্টেরল কী? কলেস্টেরল কত প্রকার? কলেস্টেরল থেকে বাচার উপায় কি কি?
কলেস্টেরল এক ধরনের চর্বি। এটি কয়েক ধরনের হয়ে থাকে ট্রাইগ্লিসারাইড, এলডিএল, এইচডিএল এবং টোটাল কোলেস্টরল। এর মধ্যে একটা হলো উপকারী। আর তিনটি শরীরের জন্য ক্ষতিকর।
ক্ষতিকর যে তিনটি আছে এটি কী ক্ষতি করে থাকে? এটা নিয়ে আমরা এত চিন্তিত কেন?
চিন্তিত এই কারণে, এই কোলেস্টেরল জমা হয় রক্তনালিতে। জমা হতে হতে রক্তনালির স্বাভাবিক যে রক্তস্রোত তা বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে হার্ট অ্যাটাকের ঝুঁকি বেড়ে যায়।
রক্তে কলেস্টেরল কতদিন ওষুধ খাবেন?
শরীরের চর্বি বা কলেস্টেরল নিয়ে নানা ধরনের ভুল ধারণা আমাদের মধ্যে আছে। এমনকি ডাক্তারদের মধ্যেও এটা আছে। বিশেষ করে মেডিসিনে যারা প্র্যাকটিস করেন তাদের অনেকের মধ্যেও একটি বদ্ধমূল ভুল ধারণা আছে। ধারণাটি হলো- যতদিন কলেস্টেরল বেশি পাওয়া যাবে ততদিন ওষুধ খেতে হবে। ব্যাপারটা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার।
শরীর গঠনে অন্যান্য উপাদানের মতো চর্বি একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। কোটি কোটি দেহকোষের প্রাচীর, বহুসংখ্যক হরমোনসহ অসংখ্য শরীরবৃত্তীয় ক্রিয়া বিক্রিয়ার অত্যাবশ্যকীয় উপাদান হলো কলেস্টেরল। প্রাণীর মস্তিষ্কের প্রায় পুরোটাই কলেস্টেরল দিয়ে তৈরি। তাহলে কলেস্টেরল খারাপ হবে কেন? বিষয়টি খারাপের বা ভালোর নয়। প্রতিটি জিনিসেরই একটি মাত্রা থাকে। মাত্রা ছাড়িয়ে গেলেই সমস্যা দেখা দেয়। আমাদের কলেস্টেরল মাত্রা জানতে হলে অন্তত ১০ ঘণ্টা খালি পেটে একটি লিপিড প্রোফাইল করা দরকার।
লিপিড প্রোফাইলে Total Cholesterols, High Density Lipoprotein-HDL, Low Density Lipoprotein- LDL এবং Triglycerides এর বিস্তৃত বিবরণ থাকে। এই চারটি উপাদানের আনুপাতিক উপস্থিতি পরবর্তী চিকিৎসা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেকে শুধু total Cholesterols এবং Triglycerides পরীক্ষা করার উপদেশ দিয়ে থাকেন। তাতে করে HDL এবং LDL এর পরিমাণ সুনির্দিষ্ট করে বোঝা সম্ভব হয় না। সুতরাং বয়স ৩০ হলে অথবা পরিবার বা বংশে যদি অল্প বয়সে কেউ হৃদরোগ বা স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তাহলে লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষা করা।
রক্তে কলেস্টেরল ভালো নাকি খারাপ :
রক্তনালির দেয়ালে জীবন্ত কোষের অবিরাম ভাঙাগড়া চলতে থাকে। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে এটি পারফেক্ট ব্যালান্স থাকে। কিন্তু যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, উচ্চ কলেস্টেরল আছে, যারা ধূমপান বা তামাকজাত দ্রব্য গ্রহণ করেন, স্থূল শরীর ব্যায়ামহীন কাটান তাদের রক্তনালির জীবন্ত কোষের ভাঙা গড়ার প্রক্রিয়াটি ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে। কোষের এই ভাঙাগড়ার প্রক্রিয়ায় HDL কলেস্টেরল রক্তনালি রক্ষায় পজিটিভ ভূমিকা পালন করে। এ জন্য একে গুড কলেস্টেরল বলা হয়ে থাকে।
আর LDL কলেস্টেরল বিশেষ করে পরিবর্তিত Oxidized LDL রক্তনালির দেয়ালে এক ধরনের প্রদাহ সৃষ্টি করে। ধীরে ধীরে এই প্রদাহের ফলে রক্তনালির গাত্রে চর্বির দলা (Plaque)গড়ে ওঠে রক্তনালিকে সরু করে রক্তের প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করে। সাধারণ মানুষ এটাকে ব্লক বলে থাকেন। কোনো ব্লক যখন রক্তনালির কমপক্ষে ৭০% ভাগ লুমেন সরু করে দেয় তখন অল্প পরিশ্রমে বুকে ব্যথা, চাপ, শ্বাসকষ্ট বা Aodo শুরু হয়ে যায়। চিকিৎসার ভাষায় এটাকে বলে অ্যানজাইনা। তাহলে দেখা যাচ্ছে যে, হার্ট ব্লক বা ব্রেন স্ট্রোক সৃষ্টিতে কলেস্টেরলের ভূমিকা কেন্দ্রীয়। যার যত গুড কলেস্টেরল (HDL) বেশি থাকবে এবং মন্দ কলেস্টেরল (LDL) কম থাকবে সে তত নিরাপদ থাকবে।
কেন এই ভারসাম্যহীন কলেস্টেরল?
শরীরের চর্বি তৈরির কারখানা হলো লিভার। যার লিভার চর্বি তৈরির জন্য যত মুখিয়ে থাকে সে যতই শাকসবজি ঘাস খাক না কেন লিভার তার কাজ চালিয়ে যাবেই। এটা হয় যখন শরীরের মেটাবলিজম পাল্টে যায়। বিশেষ করে ডায়াবেটিস, থাইরয়েড হরমোনের ঘাটতি, অ্যালকোহল পান, বাড়তি ওজন, হাঁটাচলা না করা ইত্যাদি ব্যাপারগুলো উপস্থিত থাকে। এসব কারণে লিভারের কোষে রিসেপ্টর সমস্যা দেখা দেয়। ফলে অতিরিক্ত মন্দ কলেস্টেরল রক্তে ভাসতে থাকে। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গে বিশেষ করে হার্ট ও ব্রেণের রক্তনালির দেয়ালে চর্বির দলা জমে ব্লক তৈরি করতে থাকে।
কলেস্টেরল প্রতিরোধের উপায় কী?
ডায়াবেটিসকে পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। উচ্চ রক্তচাপের উপযুক্ত চিকিৎসা করতে হবে। ধূমপান ও অ্যালকোহল বর্জন করতে হবে। ওজন কমাতে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ ও নিয়মিত ব্যায়াম করতে হবে। প্রয়োজনে চর্বি কমাতে নিয়মিত Statin জাতীয় ওষুধ খেতে হবে। ডায়াবেটিস যাদের আছে তাদের বয়স ৪০ হলে সারাজীবনের মতো Statin খেতে হবে।
ডায়াবেটিসের ওষুধ যেমন সারাজীবন খেতে হয় তেমনি চর্বির ওষুধও সারাজীবন খেতে হবে। অস্বাভাবিক পরিস্থিতি ছাড়া Statin কখনো বন্ধ করা যাবে না। অনেক ডাক্তারকে দেখা যায় চর্বির মাত্রা স্বাভাবিক হলে ওষুধ বন্ধ করে দেন। এটা ভুল ধারণা ও অবৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত। ডায়াবেটিসের ওষুধ বন্ধ করলে রক্তের সুগার যেমন বেড়ে যায়, তেমনি কলেস্টেরলের ওষুধ বন্ধ করলে তা বাড়বেই।
লক্ষ্যমাত্রা কত?
গুড কলেস্টেরল (HDL) পুরুষের ক্ষেত্রে ৪০ মিলিগ্রামের ওপরে এবং মহিলাদের ক্ষেত্রে ৫০ মিলিগ্রামের ওপরে থাকতে হবে। মন্দ কলেস্টেরলের (LDL) মাত্রা সুস্থ মানুষের জন্য ১৩০ থেকে ১৬০ মিলিগ্রামের মধ্যে থাকতে হবে। তবে যাদের ডায়াবেটিস আছে তাদের ক্ষেত্রে ১০০-এর মধ্যে রাখা নিরাপদ। আর যাদের ইতিমধ্যে হার্টে ব্লক ধরা পড়েছে বা ব্রেন স্ট্রোক অথবা পায়ের রক্তনালিতে ব্লক ধরা পড়েছে তাদের ক্ষেত্রে LDL এর মাত্রা ৭০ মিলিগ্রামের নিচে রাখতে হবে। Triglycerides এর মাত্রা ২০০ মিলিগ্রাম নিচে রাখলে ভালো।
কলেস্টেরল হলে কী কী খাবেন-
প্রচুর তাজা শাক-সবজি, ফলমূল, উদ্ভিদ প্রোটিন বেশি করে খাবেন। পর্যাপ্ত মাছ খাবেন, সামুদ্রিক মাছ হলে আরও ভালো। মাংস খেতে চাইলে সপ্তাহে দুই দিন মুরগির মাংস খেতে পারেন, তবে চামড়া, গিলা, কলিজা এসব ভিতরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বাদ দিয়ে খাবেন। দিনের দুই বেলা ব্রাউন রুটি এবং দুপুরে একবেলা পরিমিত পরিমাণে ভাত খাবেন।
কলেস্টেরল হলে কী কী খাবেন না
শরীরের মোট চর্বির প্রায় ৮০ শতাংশ তৈরি বা নিয়ন্ত্রণ করে লিভার। বাকি মাত্র ২০ শতাংশ আসে খাদ্য থেকে। তাই চর্বি নিয়ন্ত্রণে খাদ্য উপাদানের প্রভাব তুলনামূলক কম। তা সত্ত্বেও প্রাণিজ লাল মাংস যেমন : গরু, খাসি, ভেড়া, দুম্বা, মহিষ, উট, হাঁস এবং ঘি, মাখন, সরযুক্ত ঘন দুধ, চিংড়ি, পোলাও, বিরানি, যে কোনো তেলে কড়কড়ে ভাজা খাদ্য ইত্যাদি এড়িয়ে চলা উত্তম।
কলেস্টেরল কিভাবে আমাদের ক্ষতি করে? একটি গল্পের মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করি।
আমাদের শরীর যদি একটা ছোট্ট শহর হয় তবে এই শহরের প্রধান সমাজবিরোধী হচ্ছে কোলেষ্টেরল।
এর সাথে কিছু সাঙ্গ পাঙ্গ আছে। তবে একেবারে ডানহাত ট্রাইগ্লিসারাইড।
এদের কাজ হচ্ছে রাস্তায় রাস্তায় মাস্তানি করে রাস্তা block করা , শহরকে ব্যতিব্যস্ত রাখা। হৃৎপিন্ড হলো এই শহরের প্রাণকেন্দ্র। শহরের সব রাস্তাগুলো এসে মিশেছে প্রাণকেন্দ্রে।
সমাজবিরোধীর সংখ্যা বেশী হলে কি হয়?
আপনারা সবাই জানেন। এরা নিত্য নতুন হাঙ্গামা বাধিয়ে শহরের প্রাণকেন্দ্রকে অচল করে দিতে চায়।
আমাদের শরীর নামক শহরে কি পুলিশ নেই ? যারা মাস্তানদের ক্রসফায়ার করবে, তাদের ছত্রভঙ্গ করে জেলে ভরবে ?
হ্যাঁ, আছে। তার নাম HDL। এই ব্যক্তি পাড়ায় পাড়ায় মাস্তানী করা এসব মাস্তানদের রাস্তা থেকে তুলে এনে জেলে ভরে রাখে।
এখানে জেল মানে লিভার । লিভার এইগুলোকে বাইল সল্ট বানিয়ে শহরের পয়নিষ্কাশন লাইনের মাধ্যমে (পায়খানার সাথে) শহর থেকে বের করে দেয়। কি অদ্ভুত শাস্তি মাস্তানদের! আর একজন আছে LDL.
তিনি আবার ক্ষমতালোভী। তিনি ক্ষমতার জোরে তাদের জেলখানা থেকে তুলে আবার রাস্তায় বসিয়ে দেন। মাস্তানদের মাতলামো তে পুরো শহরে জ্যাম লেগে যায়।
H D L হায় হায় করে দৌড়ে আসে। কিন্তু সে L D L আর মাস্তানদের যৌথ শক্তির সাথে পেরে ওঠেনা। পুলিশের (H D L) সংখ্যা যত কমে মাস্তানরা ততই উল্লসিত হয়।
শহরের পরিবেশ হয়ে ওঠে অস্বাস্থ্যকর।
এমন শহর কার ভালো লাগে বলুন?
আপনি যদি মাস্তানদের কমিয়ে পুলিশ বাড়াতে চান? তবে হাঁটুন।
আপনার প্রতি কদমে পুলিশ পোস্টিং (H D L) বাড়বে, যত পুলিশ বাড়বে , ততই Cholesterol (মাস্তান) Triglyceride (মাস্তানের চামচে) , L D L (মাস্তানদের গড ফাদার) কমবে।
আপনার শহর (শরীর) প্রানচাঞ্চল্য ফিরে পাবে।
আপনার শহরের প্রানকেন্দ্র (হার্ট) মাস্তানদের অবরোধ (হার্ট ব্লক ) থেকে বাঁচবে।
আর শহরের প্রানকেন্দ্র (হার্ট) সুস্থভাবে বাঁচা মানে আপনিও সুস্থভাবে বাঁচবেন।
সেজন্য সময় বা সুযোগ পেলেই শুরু করুন ।
লেখক : ডা. মাহবুবর রহমান
সিনিয়র কার্ডিওলজিস্ট, ল্যাবএইড কার্ডিয়াক হাসপাতাল, ঢাকা।
এই আর্টিকেল টি সম্পূর্ণ পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই আর্টিকেল যদি বুঝতে কোন অসুবিধা হয় অথবা কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন, যথাক্রমে সকল কমেন্টের উত্তর দেওয়া হবে। আর নতুুন কিছু জানার থাকলে আমাদের জানান, আমরা সে-সব জানানোর চেস্টা করবো আমাদের সাথে যোগাযোগ
স্বীকারোক্তিঃ UipOka তে উপস্থাপিত সকল তথ্যই দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দ্বারা ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্দ্ধে নয় সেহেতু আমাদেরও কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল থাকতে পারে। সে সকল ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।


