প্যারালাল ইউনিভার্স এবং সার্বজনীন তত্ত্ব কী
আমরা জানি বিগ ব্যাং এর সাথে সাথে সৃষ্টি এই মহাবিশ্বের। কিছু কিছু মানুষের মতে (বিখ্যাত মানুষ) ঠিক আমার আপনার সমান্তরালে চলছে আরেকটি বা একাধিক বিশ্ব।আমাদের জন্য আমাদের ব্রহ্মাণ্ড শুধুমাত্র ততটুকুই বড় যতটা দূর থেকে আসা আলোকে আজ পর্যন্ত আমরা ডিটেক্ট করতে পেরেছি। কিন্তু সত্যি কি তাই আমাদের ব্রহ্মাণ্ড ঠিক ততোটাই বড় যতোটা দূর থেকে আলো আমাদের কাছে এসে পৌঁছাতে পেরেছে?। যদি টাইম ট্র্যাভেল সম্ভব হয়, তাহলে এর পিছনে থাকবে এই প্যারালাল ইউনিভার্স চলুন বিস্তারিত জানা যাক।
প্যারালাল ইউনিভার্স কি?
প্যারালাল ইউনিভার্স বলতে আমাদের এই ব্রহ্মান্ডের সব বস্তু সব জীব এমন কি প্রতিটি স্থিতির প্রতিরুপ কোন না কোন সমান্তরাল মহাবিশ্বে অবশ্যই মজুদ আছে। আপনার জীবনের প্রতিটি সম্ভাবনা যেটা সত্যি হতে পারত কোনো না কোনো সমান্তরাল মহাবিশ্বে সেটা ঘটে চলেছে।প্যারালাল ইউনিভার্স বা সমান্তরাল বিশ্ব হচ্ছে এমন একটি তত্ত্ব যেখানে বলা হয়েছে মহাবিশ্বে একাধিক পৃথিবী রয়েছে এবং তারা একটি অন্যটির প্রতিরূপ।
প্যারালাল ইউনিভার্স আমাদের ব্রহ্মাণ্ডের মতো আরও একটি বা একাধিক ব্রহ্মাণ্ড যা ঠিক আমাদেরই মতো। প্যারালাল ইউনিভার্সের কথা বলার আগে কয়েকটা জিনিস জেনে রাখা দরকার, যেমন 'ডিজে ভু'। এটি একটি ফ্রেঞ্চ শব্দ এর অর্থ এমন কিছু দেখা যা দেখে আপনার মনে হবে এটা আগে কখনো দেখেছেন বা এমন কিছু আপনার সাথে আগে ঘটেছিল। কিন্তু সত্যিটা হলো এমন কিছু আগে আপনার সাথে কখনও ঘটেনি। ঘটনার শুরু সেই প্রায় ১৩.৭ বিলিয়ন বছর আগে।
অতি ক্ষুদ্র এক বিন্দু যাকে বর্তমানে আমরা সিংগুলারিটি বলে চিনি সেটা খানিকটা বিস্ফোরিত হয়ে প্রচণ্ড গতিবেগে বেলুনের মতো এই মহাবিশ্ব প্রসারিত হতে লাগলো। এই বিগ ব্যাংয়ের পর থেকেই মহাবিশ্বের শুরু। এর আগে আমাদের জ্ঞাত স্থান-কাল এমনকি সময়ের অস্তিত্বও ছিল না। কেউ কেউ হয়তো ভাবছেন তাহলে বিগ ব্যাং এর আগে কি ছিল? এই প্রশ্নটির উত্তর কিছুই ছিল না। এই প্রসংগে পরে আসছি, আপাতত এইটুকুনই জেনে রাখুন। তো আমাদের এই মহাবিশ্বের প্রকৃতি আমরা ব্যাখা করি আমাদের জানা মৌলিক চারটি বল দিয়ে। এগুলো হলো- মহাকর্ষ,তড়িৎচুম্বকীয়, সবল নিউক্লীয় ও দুর্বল নিউক্লীয়।
চলুন একটা উদাহারণ দিয়ে প্যারালাল ইউনিভার্স বোঝানো যাক
ধরে নিই আমি এই গ্রহে একজন বিজনেস ম্যান কিন্তু এমনো হতে পারে সমান্তরাল মহাবিশ্বের গ্রহে আমি একজন লেখক। হয়তো আমি শফিকুল ইসলাম এই গ্রহে একজন বেকার লোক, কিন্তু অন্য গ্রহে আমি একজন লেখক হতে পারি। অথবা এটাও হতে পারে যে, পৃথিবীতে আপনারা এখন আমার লেখাটি পড়ছেন কিন্তু অন্য গ্রহে আপনারা এটা আগেই দেখে ফেলেছেন। এই থিউরির ধারণামতে, এই জগতের মতো অসংখ্য জগৎ আছে এবং আপনার মত আরও অসংখ্য আপনি আছেন যেগুলো সমান্তরালে চলে। কেউ কারও উপর কোন প্রভাব ফেলে না।
পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে সবচেয়ে যুগান্তকারী বিপ্লব ঘটান সম্ভবত আইজ্যাক নিউটনই।
তিনিই প্রথম প্রকৃতির কোনো মৌলিক বলকে গাণিতিক ছাচে ফেলেন। বলটি হলো মহাকর্ষ। মহাকর্ষকে আবিষ্কার করে নিউটন পদার্থবিদ্যার জগতে হইচই ফেলে দেন। তার থিওরি অনুসারে প্রত্যেক ভর সম্পন্ন বস্তই একে অন্যকে আকর্ষণ করে। এই আকর্ষণ বলেকেই বলে মহাকর্ষ( যারা আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতা সম্পর্কে একটু আধটু জানেন তারা আমার কথার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ পরে করে একটু সবুর করুন )।
এরপর আসে তড়িৎ ও চুম্বকীয় বল। লোকে আগে এগুলোকে আলাদা মনে করতো। কিন্তু কিছু ঘটনা প্রত্যক্ষ করে তারা বিজ্ঞানীরা এদের ভিতর কোনো সম্পর্কের আচ পান। কিন্তু জেমস ক্লার্ক ম্যাক্সওয়েলই এদেরকে এক করে প্রথম গাণিতের জালে আটকান। এটাই আমাদের সবার জানা বিখ্যাত ম্যাক্সওয়েলের তড়িচ্চুম্বকীয় সূত্র।
এরপর আস্তে আস্তে সবল ও দুর্বল নিউক্লিয় বল আবিষ্কৃত হয়। মজার কথা হলো সবল নিউক্লিয় বল মহাকর্ষের চেয়ে লক্ষগুণ শক্তিশালী হলেও এর বিস্তার কিন্তু অনেক ছোট ( পরমাণু যেমন ছোট )। ঠিক এই কারণেই পরমাণুতে প্রোটনগুলো তড়িচ্চুম্বকীয় বলকে টুপি দেখিয়ে নিজেদেরকে শক্ত করে আটকে রাখে। আর মহাকর্ষ সবচেয়ে দুর্বল হলেও এর বিস্তার অনেক।
কিন্তু সমস্যা হলো নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে কিছু ত্রুটি ও ব্যাখা না করা গলদ ছিল। এছাড়াও গ্রহের কক্ষপথ নিয়েও সমস্যা হচ্ছিল।
আইনস্টাইন তার বিশেষ আপেক্ষিকতার সাথে মহাকর্ষ সূত্রের এই গলদ দেখে একে সংশোধনের জন্য উঠে পড়ে লাগেন। কিন্তু ফলাফল আরো বিস্ময়কর হলো। তিনি এবার স্থান-কালকেই এক করে ফেললেন এবং বললেন ভারী বস্তু স্থান-কালকে বাকিয়ে দেয়। আমরা এটা স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করিনা বিধায় আমাদের কাছে এটা বলের মতো লাগে।
এখন পর্যন্ত সব পরীক্ষায় আপেক্ষিকতার তত্ত্ব উত্তীর্ণ হয়েছে। কিন্তু সমস্যা বাধলো অন্য জায়গায়। মহাকর্ষ বাদে অন্য সব কয়টি বলকে ব্যাখা করা যায় অতি ক্ষুদ্র জগতের তত্ত্ব কোয়ান্টাম মেকানিক্স দ্বারা। আর মহাকর্ষকে ব্যাখা করা যায় সাধারণ আপেক্ষিকতা দ্বারা। কোয়ান্টাম বলবিদ্যা অতি ক্ষুদ্র জায়গার ক্ষেত্রে খাটে, কিন্তু আপেক্ষিকতা খাটে বিশাল সব ভারী বস্তুর ক্ষেত্রে। একটার সাথে অন্যটার কোনো সম্পর্ক নেই।
কিন্তু এখন দরকার হচ্ছে এমন একটা সার্বজনীন থিওরির যা সব কয়টি বলকে ব্যাখা করতে পারবে।
দ্য থিওরি অব এভরিথিং বা সবকিছুর তত্ত্ব।
এখন প্রশ্ন হলো কেন এই থিওরি লাগবে? পৃথক হলেও তো দুটি থিওরি দ্বারা সবকিছু আমরা ব্যাখা করতে পারছি।
উওর হলো সেই সিংগুলারিটি পয়েন্টে কিন্তু সবকটি বল একত্রে ছিল। তাই সেই একত্রীকরণ থিওরিটি আবিষ্কৃত হলে বিগ ব্যাং এর অনেক রহস্য উদঘাটিত হবে। এমনকি আমরা জানতেও পারি কি ছিল বিগ ব্যাং এর আগে! কিন্তু এই থিওরি আবিষ্কার করা যথেষ্ট কষ্টসাধ্য ( এখন পর্যন্ত পর্যবেক্ষিত )।
স্বয়ং আইনস্টাইনও তার শেষ জীবনে প্রকৃতির সবকটি বলকে একত্র করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু মৃত্যুর কাছে অবশেষে হার মানায় সেটা আর করে যেতে পারেননি। এরপর কোয়ান্টাম মেকানিক্স ও রিলেটিভিটিকে এক করার জন্য বহু পদার্থবিদ অনেক চেষ্টা করেছেন। তবে সবচেয়ে আলোচিত তত্ত্বটি হলো স্ট্রিং তত্ত্ব।
এখন প্রশ্ন হলো স্ট্রিং থিওরি আবার কি?
তার আগে মৌলিক কণা সম্পর্কে কিছু জানা দরকার। আমরা জানি, এই মহাবিশ্বের সবকিছুই পরমাণু দিয়ে গঠিত। এটা এতোই ছোট যে সাধারণ মাইক্রোস্কোপ দিয়েও দেখা যায় না। এই পরমাণুর ভিতর আবার ইলেক্ট্রন, প্রোটন, নিউট্রন নামক আরো ক্ষুদ্র কণা থাকে। ইলেক্ট্রন নিজেই এক ধরণের মৌলিক ফার্মিয়ন বস্তুকণা লেপ্টন। তাই একে আর ভাঙা যায় না। তবে প্রোটন ও নিউট্রন আরেক ধরণের ফার্মিয়ন কোয়ার্ক দ্বারা গঠিত। কোয়ার্ক ছয় প্রকার। তবে প্রোটন-নিউট্রন শুধু আপ ও ডাউন কোয়ার্ক দিয়ে তৈরি।
তো বেশি কথা না বলে আসল কথায় আসি। আমাদের আধুনিক প্রযুক্তি দ্বারা এখন পর্যন্ত আমরা কোয়ার্ক পর্যন্ত দেখতে পাই এবং একে আমরা সর্বমৌলিক কণা বলি। কিন্তু স্ট্রিং থিওরির গাণিতিক ব্যাখা বলে কোয়ার্ক তৈরি হয় আরো ক্ষুদ্র এক প্রকার তন্তুর প্রচণ্ড কম্পনের জন্য। ব্যাপারটা খানিকটা একটা ইলেক্ট্রিক ফ্যানের ঘুর্ণনের মতো। প্রচণ্ড বেগে ঘুরলে মনে হয় পুরো একটা গোলক ঘুরছে। এই অতি ক্ষুদ্র তন্তুর কারণে এর নাম হয়েছে স্ট্রিং থিওরি। স্ট্রিং থিওরির শুরু হয়েছে পঞ্চাশের দশকে। তখন এই থিওরি শুধু সবল নিউক্লিক বলকে ব্যাখা করতে পারতো। পদার্থবিদরা এক্সেলারেটরে দেখলেন যে প্রোটন কিংবা নিউট্রনের সাথে পাই মেসনের বিক্রিয়া ঘটলে প্রচুর রেজোন্যান্স পার্টিকেল বা অনুনাদ কণা উৎপন্ন হতো। তখন এই অনুনাদ কণাকে ব্যাখা করার জন্যই স্ট্রিং থিওরিকে ব্যবহার করা হতো। কেউ তখনও ভাবতে পারেনি যে একদিন এই থিওরিই পদার্থবিদ্যার জগতে ওলটপালট ঘটিয়ে দেবে।
তো স্ট্রিং থিওরির সাধারণ সংক্ষিপ্ত পরিচয় সেরে নিয়ে মূল টপিকে আসি। স্ট্রিং থিওরিতে প্রথম দিকে গাণিতিক ত্রুটি ছিল অনেক। ফলে অধিকাংশই এই থিওরির প্রতি মুখ ফিরে তাকায়নি। এরপর পদার্থবিজ্ঞানী জন শোয়ার্জ ও জোয়েল শার্ক ১৯৭৪ সালে গাণিতিক ব্যাখার মাধ্যমে গ্রাভিটন নামক এক ধরণের কোয়ান্টাম কণার কথা বলে যার স্পিন সংখ্যা ২ এবং এটা মহাকর্ষ বলকে ব্যাখা করতে পারে আইনস্টাইনের রিলেটিভিটি থিওরি মেনেই। নিঃসন্দেহে এটা একটা যুগান্তকারী ঘটনা ছিল। বিজ্ঞানীদের বহুকাল ধরে কাংক্ষিত সেই সার্বজনীন তত্ত্ব কি তবে এর মাধ্যমে বেরিয়ে আসবে? হ্যা,
অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে এটাই হলো, তবে এখনো সেটি নিশ্চিত না। কিন্তু এতেও অনেক গাণিতিক ত্রুটি ছিল। কিন্তু জোয়েলের মৃত্যু হলেও দশ বছর পর মাইকেল গ্রীনের সহযোগিতায় সব গাণিতিক ত্রুটি দূর হলো। আশ্চর্যজনক হলেও এই থিওরি বলে এই মহাবিশ্ব ২৬ মাত্রার। কিন্তু বিজ্ঞানীসমাজ এটাকে মেনে নেয়নি। ফলে আবার তত্ত্বটিকে ঘসামাজা করতে হয়। এর আরেকটি কারণ এটা শুধু বোসন কণাকে ব্যাখা করতে পারতো, তাই নাম ছিল বোসনিক স্ট্রিং থিওরি। কিন্তু ফার্মিয়ন কণার ক্ষেত্রে এই থিওরি খাটতো না। বলে রাখা ভালো, স্পিন সংখ্যার ভিত্তিতে এই মহাবিশ্বের সকল কণাকে বোসন ও ফার্মিয়ন এই দুই ভগে ভাগ করা হয়। সংশোধনের ফলে বেরিয়ে আসে সুপারস্ট্রিং থিওরি। এই থিওরি বলে আমাদের মহাবিশ্ব ১০ মাত্রার, তবে অতি মাত্রায় কুচকানো বলে একে দেখা যায় না। এবার আর কোনো সমস্যা ছিল না।
এই থিওরি মতে আমাদের চেনাজানা মহাবিশ্বের বাইরেও অনেক মহাবিশ্ব আছে। একেই সমান্তরাল মহাবিশ্ব বা প্যারালাল ইউনিভার্স বলে। আর মজার কথা হলো এই সংখ্যাটা পায় ১০^৫০০ টি। অর্থাৎ মহাবিশ্বের শুরুর সময় থেকে আপনি প্রতিটি প্রতি সেকেণ্ডে ১০০০ টি মহাবিশ্ব ভ্রমণ করলেও সব কয়টি মহাবিশ্ব ভ্রমণ করে শেষ করতে পারবেন না।
স্ট্রিং থিওরি পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে বিপ্লব ঘটিয়ে দিল। অতি ক্ষুদ্র কোয়ান্টামের জগত থেকে অতি বৃহৎ মহাবিশ্বকেও এটা ব্যাখা করতে পারে। এক দিকে দিল আমাদের অতি প্রয়োজনীয় সার্বজনীন তত্ত্ব আর অন্যদিকে খোজ দিল আমাদের চেনা মহাবিশ্বের বাইরে আরো অনেক মহাবিশ্বের। তবে এখনই খুশি হওয়ার দরকার নেই। এই তত্ত্বটি এখনও প্রমাণিত নয়। কারণ স্ট্রিং এর আকার অতি ক্ষুদ্র। আগামী কয়েক দশক পরের প্রযুক্তি দিয়ে একে দেখা যাবে কিনা যে বিষয়েও আমরা নিশ্চিত নই। তবে প্রমাণিত হলে নিশ্চয়ই পদার্থবিজ্ঞানের জগতে বড়সড় পরিবর্তন আসবে।
copyright. Sohel adnan
এই আর্টিকেল টি সম্পূর্ণ পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই আর্টিকেল যদি বুঝতে কোন অসুবিধা হয় অথবা কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন, যথাক্রমে সকল কমেন্টের উত্তর দেওয়া হবে। আর নতুুন কিছু জানার থাকলে আমাদের জানান, আমরা সে-সব জানানোর চেস্টা করবো আমাদের সাথে যোগাযোগ
স্বীকারোক্তিঃ UipOka তে উপস্থাপিত সকল তথ্যই দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দ্বারা ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্দ্ধে নয় সেহেতু আমাদেরও কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল থাকতে পারে। সে সকল ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
