আসসালামু আলাইকুম! আশা করি আল্লাহ এর অশেষ রহমতে আপনারা সবাই ভালো আছেন।আমিও আপনাদের দোয়াই ভালো আছি। আজ আপনাদের কাছে একটা নতুন আর্টিকেল নিয়ে হাজির হয়েছি। তাই কথা না বাড়িয়ে চলুন সরাসরি আর্টিকেলটির মুল অংশে প্রবেশ করি।
আজকের আর্টিকেল এর মূল বিষয় হলোঃ
জ্বর হলেই এন্টিবায়োটিক নয় | এন্টিবায়োটিকের সাইড ইফেক্ট সম্পর্কে জেনে নিন
জ্বর কোনো রোগ নয়- অনেক রোগের কারণে জ্বর হতে পারে। জ্বর কেবলই রোগের উপসর্গ মাত্র। এযাবৎকাল ৭২টি রোগের কারণে জ্বর হতে পারে বলে জানা গেছে- অজানা কারণের সংখ্যা জানা যায়নি।
জ্বর, সর্দি, ঠাণ্ডা-কাশি, হলেই অ্যান্টিবায়োটিক দিতে হবে কি-না, সে বিষয়ে চিকিৎসকই সিদ্ধান্ত নেবেন। সাধারণত ভাইরাসজনিত কারণে ফ্লুর মতো হয় যা ৩-৫ দিনে চলে যায়, এখানে অ্যান্টিবায়োটিকের দরকার নেই। শুধু প্যারাসিটামল এবং অ্যান্টি হিস্টামিনই যথেষ্ট।
অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার করেছিলেন স্যার আলেকজান্ডার ফ্লেমিং। ফ্লেমিং স্যার বলেছিলেন,
"এই এন্টিবায়োটিকের কারণে আজ কোটি কোটি লোক বেঁচে যাবে। অনেক বছর পর এগুলো আর কাজ করবেনা। তুচ্ছ কারণে কোটি কোটি লোক মারা যাবে আবার।''
এন্টিবায়োটিক খাওয়ার কিছু নিয়ম আছে। একটা নির্দিষ্ট ডোজে, একটা নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত এন্টিবায়োটিক খেতে হয়। না খেলে যেটা হতে পারে সেটাকে বলা হয় "এন্টিবায়োটিক রেজিসটেন্স''।
ধরি, আমার দেহে এক লক্ষ ব্যাকটেরিয়া আছে। এগুলোকে মারার জন্য আমার ১০টা এম্পিসিলিন খাওয়া দরকার। এম্পিসিলিন এক প্রকার এন্টিবায়োটিক। খেলাম আমি ৭ টা। ব্যাকটেরিয়া মরলো ৭০ হাজার এবং আমি সুস্থ হয়ে গেলাম। ৩০ হাজার ব্যাকটেরিয়া কিন্তু রয়েই গেলো। এগুলো শরীরে ঘাপটি মেরে বসে জটিল এক কান্ড করলো নিজেরা নিজেরা।
তারা ভাবলো, যেহেতু এম্পিসিলিন দিয়ে আমাদের ৭০ হাজার ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। অতএব আমাদেরকে এম্পিসিলিন প্রুফ জ্যাকেট পরতে হবে এবার। প্ল্যান করে থেমে থাকেনা এরা, বরং সত্যি সত্যি জ্যাকেট তৈরি করে ফেলে এই ব্যাকটেরিয়া গুলো। এরা বাচ্চা-কাচ্চাও পয়দা করে একই সময়ে। বাচ্চাদেরকেও সেই জ্যাকেট পরিয়ে দেয়।
এর ফলে যেটা হয়, পরের বার এম্পিসিলিন নামক এন্টিবায়োটিকটা আর কাজ করেনা।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় হচ্ছে, জ্যাকেট পরা ব্যাকটেরিয়া গুলো কেবল ঐ ব্যাক্তির শরীরেই বসে থাকেনা। তিনি হাঁচি দেন, কাশি দেন, ব্যাকটেরিয়া গুলো ছড়িয়ে পড়ে পুরো এলাকায়। এক সময় পুরো এলাকায়ই আর ঐ এন্টিবায়োটিক কাজ করেনা। যারা খুব নিয়ম করে ওষুধ খান তারাও বিপদে পড়ে যান সবার সাথে।
আমরা খুব ভয়ংকর একটা সময়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি দ্রুত। ব্যাকটেরিয়া আর তাদের বিভিন্ন 'জ্যাকেট'এর তুলনায় এন্টিবায়োটিকের সংখ্যা খুব বেশি না। অনেক এন্টিবায়োটিক এখন আর কাজ করেনা, বাকিগুলোর ক্ষমতাও কমে আসছে। আমাদের বড় বড় হসপিটাল থাকবে, সেখানে এফসিপিএস, এমডি, পিএইচডি করা ডাক্তাররা থাকবেন কিন্তু কারোরই কিছু করার থাকবেনা। সামান্য সর্দীতেই রোগী মরে সাফ হয়ে যাবে।
উন্নত বিশ্বের চিকিৎসা ব্যবস্থা আলাদা। তারা নিয়ম মেনে ডাক্তারের পরামর্শ মতো ওষুধ খায়। বিপদে আছি আমরা। 'মেডিসিনের বাইবেল' নামে পরিচিত ডেভিডসের বইয়েও আমাদের এই উপমহাদেশের উল্লেখ আছে আলাদা করে। অনেক ট্রিটমেন্টে বলা হয়েছে,
"This organism is registrant against this Drugs in Indian subcontinent''
টিভি পত্রিকায় নানান বিষয়ে মানুষকে সচেতন করা হয়। বাথরুম করে হাত ধুতে হবে, কাশি হলে ডাক্তার দেখাতে হবে, নিরাপদ পানি খেতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এন্টিবায়োটিক নিয়ে কোনো কিছু আজও চোখে পড়েনি। অথচ এটা অন্যগুলোর চেয়েও জরুরী। এন্টিবায়োটিক কাজ না করলে এত সচেতনতা দিয়েও আর লাভ হবেনা।
আগুন নিয়ে খেলছে ফার্মেসিওয়ালারা
রোগী ফার্মেসীতে গিয়ে একটু জ্বরের কথা বললেই ফার্মেসীতে বসে থাকা সেই লোকটি দিয়ে দিচ্ছে Azithromycin or Cefixime or Cefuroxime or Levofloxacin নামক কিছু নামকরা দামী এন্টিবায়োটিক, কিন্তুু কতো দিন খেতে হবে সেটা না জানিয়ে সুন্দর করে বলে দেয় এই ওষধটি ১ ডোজ খাবেন সব রোগ ভালো হয়ে যাবে আর এই ভাবেই আস্তে আস্তে Resistance হচ্ছে সব এন্টিবায়োটিক।
চিকিৎসা ব্যবস্থার সাথে যারা জড়িত তাদেরকে এখনই ব্যাপারটা নিয়ে ভাবা উচিত। সবাইকে এন্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার বিষয়ে সচেতনতা বাড়াতে হবে। না হলে আমাদের ভবিষ্যত অন্ধকার।
এন্টিবায়োটিক নয় জ্বর হলে সচেতনতা প্রয়োজন:
১. যেকোনো ভাইরাস জ্বর ৩ থেকে ৫দিন টানা ১০২/১০৩°f আসতে পারে এবং কমলে, ১০১ এর নিচে নাও নামতে পারে। কাজেই জ্বর শুরু হওয়ার পরের বেলাতেই বা পরের দিন জ্বর কেনো কমছে না, অস্থির হওয়া যাবে না।
২. একদিনে জ্বর কমিয়ে দেয়ার কোনো মেডিসিন বা ম্যাজিক ডাক্তারদের জানা নাই। ভাইরাস জ্বরে এন্টিবায়োটিক কোনো কাজে লাগে না যদি না কোন ইনফেকশনের সোর্স পাওয়া যায় যা অনেকসময় প্রকাশ পেতে ৩দিনও লেগে যায়।
৩. জ্বর হলে বাচ্চা খাওয়াদাওয়া ছেড়ে দিবে, বড়রাও দেয়। এই অরুচির প্রাথমিক কোনো চিকিৎসা নাই। সবার মতো আপনাকেও বুঝিয়ে শুনিয়ে অল্প অল্প করে পানি, তরল জাউ, স্যুপ, শরবত বা বাচ্চা যেটা খেতে চায় ( এমন কিছু দিবেন না যা আবার বমি, পাতলা পায়খানা ঘটায়) তাই খাওয়াবেন। প্রস্রাব যেন অন্তত ৪ বার হয়। মুখে একদমই খেতে না পারলে, প্রস্রাব কমে গেলে, বমি বন্ধ না হলে বা খিচুনি হলে বাচ্চাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবেন।
৪. হালকা জ্বরে ( ১০০ থেকে ১০২°) গা মুছে দিবেন, মুখে ঔষধ খাওয়াবেন। একবার ঔষধ খাওয়ানোর পর আবার সিরাপ দিতে অন্তত ৪/৬ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে। আর সাপোসিটারী দিতে হলে অন্তত ৪ ঘন্টা অপেক্ষা করতে হবে।
৫. বেশী জ্বরে ( ১০২° F এর উপরে গেলে) তাড়াতাড়ি জ্বর কমানোর প্রয়োজন হলে সাপোসিটার ব্যবহার করতে পারেন (যদিও এটা বাচ্চাদের জন্য অস্বস্তিকর), এতে জ্বর সাময়িকভাবে হয়তো ১০২ এর নিচে নামতে পারে তবে পুরোপুরি যাওয়ার সম্ভাবনা কমই ১ম তিনদিনে। একটা সাপোসিটারী দেয়ার ৮ ঘন্টার মধ্যে আরেকটা সাপোসিটারী দিতে পারবেন না। তবে ৪/৬ ঘন্টা পর সিরাপ দিতে পারেন।
৫. জ্বরের ঔষধ ডাবল ডোজে বা ঘন ঘন খাওয়ালে, এন্টিবায়োটিক দিলেই জ্বর ভালো হয়ে যাবে এমন না। ভাইরাসের পরিমানের উপর, কতদিন এরা এক্টিভ থাকে তার উপর জ্বরের স্থায়ীত্ব নির্ভর করে।
৬. জ্বরের ঔষধ খাওয়ানোর চেয়ে বাচ্চার যত্ন নিন, ভিজা গামছা বা সুতি কাপড় দিয়ে গা মুছে দিন, গরম ও নরম খাবার খাওয়ানোর চেষ্টা করুন, সবচেয়ে বড় কথা বাচ্চাকে বিশ্রাম নিতে দিন। ভালো ঘুমাতে দিন, ঘুমের মধ্যে জ্বর থাকলেও তাকে ঘুম ভাঙিয়ে জ্বরের ঔষধ খাওয়ানোর দরকার নাই।
৭. থার্মোমিটার দিয়ে মেপে জ্বর ১০০ বা বেশী পেলেই জ্বরের ঔষধ খাওয়াবেন। গায়ে হাত দিয়ে গরম লাগা, জ্বর ৯৮, ৯৯° ; জ্বরের আগে শীত শীতভাব, অস্থির করা জ্বরের ঔষধ খাওয়ানোর কোন কারণ হতে পারে না।
৮. বাচ্চাদের এসিডিটি কম হয়, তাই একদম সম্ভব না হলে, খালিপেটে জ্বরের ঔষধ দিতে পারবেন।
৯. জ্বর হলে বাচ্চা এক আধটু বমি হতে পারে, কিছু জ্বরের ঔষধেও বাচ্চাদের বমি হয়। এসব ক্ষেত্রে বমির ঔষধ লাগে না, প্রয়োজনে জ্বরের ঔষধ পাল্টান। ঔষধ খাওয়ার ১০/১৫ মিনিটের মধ্যে বমি করলে ১৫/২০ মিনিট পর আবার ঔষধটুকু খাওয়াতে হবে।
ডেঙ্গু সিজন এখন। পাশাপাশি করোনার প্রকোপ আবার বাড়ছে।কাজেই সন্দেহ হলেই আশেপাশে শিশু বিশেষজ্ঞ দেখিয়ে টেস্ট করে নিবেন।
আপনার শিশুকে সাবধানে রাখুন ও সবাই সুস্থ থাকুন।
এন্টিবায়োটিক কি?
অ্যান্টিবায়োটিক হল এমন একটি উপাদান যা ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাস থেকে সংগ্রহ করে অন্য ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়া বা ফাঙ্গাসকে ধ্বংস করার জন্য বা তার বংশবৃদ্ধি রোধ করার জন্য ব্যবহার করা হয়।
এন্টিবায়োটিক কিভাবে কাজ করে?
ব্যাকটেরিয়া নিজে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে পারে না বিধায় নিজেদের অঞ্চল থেকেই তাদের খাদ্য সংগ্রহ করার কারণে তারা একই অঞ্চলে থাকা অন্য ব্যাকটেরিয়াগুলোর সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এক অঞ্চলের ব্যাকটেরিয়া আরেক ব্যাকটেরিয়াকে মারার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক তৈরি করে। এ অ্যান্টিবায়োটিক-ই আমরা ওষুধ হিসেবে ব্যবহার করি।
এন্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ কি?
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে বিশ্বব্যাপী ‘বিশ্ব অ্যান্টিবায়োটিক সচেতনতা সপ্তাহ’ (১৬-২২ নভেম্বর) পালন করা হয়। এর উদ্দেশ্য হল মানুষকে এটি মনে করিয়ে দেয়া যে, অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধী ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যাকটেরিয়ার সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে, তাই এটি ব্যবহারের ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়া দরকার।
এন্টিবায়োটিক সেবন বিধি
নির্দিষ্ট মাত্রার নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর নির্দিষ্ট দিন পর্যন্ত সেবন করতে হবে। মেডিকেল সায়েন্সে অ্যান্টিবায়োটিকের (ব্যবহার) সেবন বিধিতে বলা হয়েছে ৫-৭ দিন, ১০ দিন পর্যন্ত দেয়া যাবে। তবে ৩ দিনের কম নয়। আবার এমন কিছু রোগও আছে যেমন- যক্ষ্মার ক্ষেত্রে ৪ পদের অ্যান্টিবায়োটিক ২ মাস, ২ পদের অ্যান্টিবায়োটিক আরও ৪ মাস অর্থাৎ ৬ মাস সেবন করতে দেয়া হয়। ফুসফুসে ফোড়ার চিকিৎসায় ২ বা ৩ পদের অ্যান্টিবায়োটিক ৪-৬ সপ্তাহ দেয়া হয়।
এন্টিবায়োটিক ব্যবহার করা হয় কেন?
অ্যান্টিবায়োটিক কেবল ব্যাকটেরিয়া নির্মূলের জন্য ব্যবহার করা হয়। যখন অ্যান্টিবায়োটিক ব্যাকটেরিয়া নির্মূলে ব্যর্থ হয় তখন উক্ত ব্যাকটেরিয়াকে রেজিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়া বলা হয়। এ রেজিস্টেন্স ব্যাকটেরিয়া হয়তো অন্য ওষুধে কাজ করবে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, কোনো ব্যাকটেরিয়াকে কোনো ওষুধ দিয়ে নির্মূল করা যাবে- সেই সিদ্ধান্ত নেয়াটাই কঠিন। কালচার সেন্সেটিভিটি টেস্টই বলে দিতে পারে- কোন ওষুধ কাজ করবে কোনটি করবে না। এ পরীক্ষা ব্যয় বহুল এবং সবার পক্ষে করা সম্ভব নয়।
এন্টিবায়োটিক অপব্যবহারের ফলাফল কি
দিন যত যাচ্ছে, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যক্ষমতা ততই কমে যাচ্ছে। বছরে ৭ লাখ থেকে কয়েক মিলিয়ন (১০ লাখ = ১ মিলিয়ন) রোগীর অ্যান্টিবায়োটিক রেজিস্টেন্সজনিত কারণে অকাল মৃত্যু হচ্ছে। যার মূলে এ ওষুধের অপব্যবহারকেই দায়ী করা হচ্ছে।
এই আর্টিকেল টি সম্পূর্ণ পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই আর্টিকেল যদি বুঝতে কোন অসুবিধা হয় অথবা কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন, যথাক্রমে সকল কমেন্টের উত্তর দেওয়া হবে।