বিগ ব্যাং থেকে বর্তমান মানবসভ্যতা পর্ব-২
‘বিগ ব্যাং’, মহাবিশ্বের সূচনা, মহাবিশ্বের সব কিছুর উৎপত্তি। সকল পদার্থ ও শক্তির সৃষ্টি। আজ থেকে প্রায় ১৪০০ কোটি বছর আগে পরমাণুর চেয়েও বহুগুণ ক্ষুদ্র প্রায় শূন্য আয়তনে ঘটা একটি বিস্ফোরণের মধ্য দিয়ে এই মহাবিশ্বের সৃষ্টি। ‘বিগ ব্যাং’ এর পর সময়ের পরিক্রমায় ধাপে ধাপে এই মহাবিশ্ব বর্তমান অবস্থায় আসে। গ্রহ, নক্ষত্র, গ্যালাক্সি সব কিছুর শুরু ‘বিগ ব্যাং’। ‘বিগ ব্যাং’ এর পর পর্যায়ক্রমে পৃথিবীর সৃষ্টি এবং পৃথিবীতে ‘প্রথম প্রাণ’ সৃষ্টির উপযুক্ত পরিবেশ গঠিত হবার সময় পর্যন্ত একটি ধারাবাহিকতা তুলে ধরা হয়েছিল প্রথম পর্বে।
আজ দ্বিতীয় পর্বে তুলে ধরা হচ্ছে পৃথিবীতে ‘আদি-প্রাণ’ নামক প্রথম প্রাণের সৃষ্টি হবার পর পর্যায়ক্রমে বর্তমান মানুষের সরাসরি পূর্বপুরুষ ‘প্রাইমেট’ এর উৎপত্তি পর্যন্ত সময়ে প্রাণের ক্রমবিকাশের ধারা।
বিগ ব্যাং এবং পৃথিবীতে সমুদ্রের এবং প্রাণের উৎপত্তিঃ
আজ থেকে প্রায় ৩৮০ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে প্রথম স্থায়ী সমুদ্রের সৃষ্টি হয়। স্থায়ী সমুদ্র সৃষ্টির প্রায় ৭ লক্ষ বছর পর সমুদ্রের তলদেশে কয়েকটি প্রাথমিক উপাদান; বিগ ব্যাং এর পর সৃষ্ট প্রথম মৌল হাইড্রোজেন, নক্ষত্রে সৃষ্ট নাইট্রোজেন, কার্বন, এবং অক্সিজেন মিলে তৈরি করে পৃথিবীতে প্রাণের সূচনা।
DNA, যে সর্পিলাকার আণুবীক্ষণিক গঠনে লুকিয়ে আছে প্রাণের রহস্য। এটি ছিল পৃথিবীর সর্বপ্রথম মহাবিপ্লব। এরপর DNA থেকে কালক্রমে তৈরি হল প্রথম অণুজীব, ব্যাকটেরিয়া। যেটি শুধু তখন নয় এখনো জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মানুষের দেহ সারা পৃথিবীর জনসংখ্যার চেয়ে বেশি সংখ্যক ব্যাকটেরিয়ার একটা ‘চিড়িয়াখানা’।
এরপর প্রায় একশ কোটি বছর পৃথিবী শুধুমাত্র নানা ধরনের অণুজীবের দখলে ছিল।
প্রায় ২৫০ কোটি বছর পূর্বে কিছু ‘বিশেষ’ ব্যাকটেরিয়া সূর্য থেকে আসা শক্তি ব্যবহার করে জীবন ধারণ করা শুরু করলো। জীবন ধারণের এ প্রক্রিয়ায় তারা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও গুরুত্বপূর্ণ বর্জ্য পদার্থটি উৎপাদন ও নিঃসরণ শুরু করলো, যার নাম ‘অক্সিজেন’।
সুতরাং আমরা এখন যে অক্সিজেনের সাহায্যে বেঁচে আছি তা আমাদের আদি-প্রাণের উচ্ছিষ্ট ছাড়া কিছুই নয়।
সেসময় সমুদ্রের পানি ছিলো প্রচুর লৌহ উপাদানে পরিপূর্ণ। ব্যাকটেরিয়া নির্গত অক্সিজেন লৌহ উপাদানের সাথে বিক্রিয়া করে তৈরি করে ভারি ধাতব-অক্সাইড যা থিতিয়ে জমা হয় সমুদ্র তলদেশে। শত কোটি বছর ধরে জমতে থাকা অক্সাইডের স্তর তৈরি করে লোহার বিশাল সংগ্রহশালা যা সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উত্থিত হয়ে এখন আমাদের কাছে “লোহার খনি” নামে পরিচিত। আপনার সুঁই থেকে শুরু করে জুতার পেরেক পর্যন্ত যত স্থানে লোহা রয়েছে তার সবার প্রাথমিক অবস্থান ও রূপান্তর একই।
পানিতে থাকা সকল অসম্পৃক্ত লৌহ উপাদান যখন অক্সাইডে পরিণত হলো, তখন অক্সিজেন মিশতে থাকলো সমুদ্রের পানিতে। সমুদ্রের পানি অক্সিজেনে পূর্ণ হবার পর অতিরিক্ত অক্সিজেন উঠে এলো সমুদ্র পৃষ্ঠ ছেড়ে বায়ুমণ্ডলে, বায়ুমণ্ডল পূর্ণ হলো পর্যাপ্ত অক্সিজেনে।
এরপর ঘটলো প্রাণের গুরুত্বপূর্ণ ও বৃহৎ একটি উত্থান। কিছু ব্যাকটেরিয়া অক্সিজেন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার কায়দা রপ্ত করলো, যাতে পূর্বের যে কোনো পদ্ধতি থেকে প্রায় ২০ গুন দক্ষতার সাথে শক্তির ব্যবহার করা গেলো।
অক্সিজেন থেকে শক্তি সংগ্রহ করে বেঁচে থাকার ফলে তাদের জৈবিক পরিবর্তন পরিবর্ধন ঘটতে থাকলো আরও দ্রুত। একাধিক অণুজীব মিলে তৈরি করতে থাকলো আরও ক্রমান্বয়ে জটিল থেকে জটিলতর জৈবিক প্রাণ।
পরবর্তী দু’শ কোটি বছর এভাবেই চলল প্রাণের জটিল থেকে জটিলতর, ক্ষুদ্র থেকে বৃহত্তর, আর এককোষী জীব থেকে বহুকোষী জীবে রূপান্তর হবার প্রক্রিয়া।
পৃথিবীতে দ্বীপের উৎপত্তিঃ
পৃথিবীর উপরিপৃষ্ঠে জেগে উঠতে থাকলো দ্বীপ আর বিস্তৃত হল স্থলভূমি। পৃথিবীর বাহ্যিক অংশ পেলো যেমনটি আজ আমরা দেখি তার কাছাকাছি একটা রূপ।
সমুদ্রের পানিতে বাড়তে থাকলো জীব বৈচিত্র্য। সৃষ্টি হল অসংখ্য ভিন্ন ভিন্ন প্রজাতির বহুকোষী উদ্ভিদ ও প্রাণী। এই সময়ের সর্বশেষ তিন কোটি বছরে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে বিবর্তিত হয়েছে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক জলজ প্রাণী।
বিগ ব্যাং এবং পৃথিবীতে প্রথম বিবর্তনের মাধ্যমে জন্ম নেওয়া মাছঃ
বর্তমান সময় থেকে প্রায় ৫০ কোটি বছর পূর্বে সমুদ্রে বিবর্তিত হয়ে সৃষ্টি হলো প্রথম কাঁটাযুক্ত দেহাভ্যন্তর বিশিষ্ট মাছ। এদেরকেই বলা যায় আমাদের সর্বপ্রথম ‘পূর্বপুরুষ’ যাদের মধ্যে প্রথমবারের মত ছিল বর্তমান জীবের মত দেহাংশ এবং দাঁতবিশিষ্ট চোয়াল সহ মুখ। প্রাণী ও উদ্ভিদ বিবর্তিত হতে থাকলো আরো নতুন বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন ও জটিল ক্ষমতা সম্পন্ন জীবে।
এর মধ্যেই পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলস্থ অক্সিজেনের একটা অংশ বায়ুমণ্ডলের উপরিভাগে তৈরি করল ‘ওযোন’ গ্যাসের আস্তরণ যা তখন থেকে এখন পর্যন্ত এমনকি ভবিষ্যতেও রক্ষা করে চলবে প্রাণের গতিধারাকে; মহাজাগতিক ও সূর্য থেকে আগত ক্ষতিকর রশ্মি ও বিকিরণের প্রভাব থেকে।
জীবের উৎপত্তি এবং ওযোন স্তরের ভূমিকাঃ
‘ওযোন’ স্তর তৈরির পূর্ব পর্যন্ত প্রাণের অস্তিত্ব ছিলো কেবল সমুদ্রের তলদেশের পানিতে। এরপর তা স্থলভূমিতে উঠে আসার পরিবেশ পেল। প্রথমে পানির নিচে থাকা উদ্ভিদরা বিবর্তিত হয়ে স্থলে বাঁচার উপযুক্ত হয়ে উঠে আসলো স্থলজ পৃথিবীতে। শিকড়ের সাহায্যে পানি আর সূর্যালোকের শক্তিতে বেঁচে থাকার শক্তি সংগ্রহ করতে থাকলো। প্রথমবারের মত উদ্ভিদের প্রাণের স্পন্দনে স্পন্দিত হলো পৃথিবী।
প্রায় চল্লিশ কোটি বছর পূর্বে জলজ প্রাণীর একটি অংশ বিবর্তিত হয়ে উভচর প্রাণীর সৃষ্টি করলো যা পানি ছেড়ে উঠে এলো মাটিতে। সূচনা হলো সমগ্র পৃথিবীতে চলমান প্রাণের বিচরণ।
পৃথিবীতে জীবের প্রথম বংশ বিস্তার এবং সরীসৃপ গোষ্ঠীর জন্মঃ
প্রাথমিক উভচরদের, বর্তমান ব্যাঙের ডিমের মত পানিতে ডিম ছেড়ে বংশবৃদ্ধি করতে হতো। তা না হলে সে ডিম স্থলে শুকিয়ে নষ্ট হয়ে যেতো। এটি ছিল তাদের সমুদ্র ছেড়েও দূরে না যেতে পারার একটি কারণ।
বিবর্তন এ সমস্যার সমাধান এনে দিল একদল উভচরের জন্য। তারা সম্পূর্ণ নতুন গঠনের ডিম দিতে শুরু করল যেটা শক্ত খোলসে আবৃত কিন্তু তার ভেতরে প্রাণের জন্য প্রয়োজনীয় ‘সমুদ্রের আর্দ্রতা’। এই বিবর্তন এধরনের উভচর থেকে কালক্রমে বিবর্তিত হল সরীসৃপ।
পৃথিবীর খনিজ কয়লা আসলে কি?
স্থলে উদ্ভিদের শুরু থেকে প্রায় ত্রিশ কোটি বছর পূর্ব পর্যন্ত উদ্ভিদ মারা যাবার পর মাটিতে মিশে যায়, বিভিন্ন প্রাকৃতিক-রাসায়নিক বিক্রিয়ায় মাটির নিচে জমা হতে থাকে যা বর্তমানে আমরা কয়লা হিসাবে উত্তোলন করছি।
পার্মিয়ন গণবিলুপ্তি কি?
প্রায় ২৫ কোটি বছর পূর্বে পৃথিবীতে বয়ে যায় এক ভয়াবহ দুর্যোগ। পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে আগ্নেয়গিরির উদগীরণ শুরু হয় দানবীয় আকারে। বায়ুমণ্ডলের অনেকাংশ ভরে ওঠে জীবনের জন্য ক্ষতিকর কার্বন-ডাই-অক্সাইডে। পৃথিবীর প্রায় ৭০ শতাংশের অধিক প্রজাতির জীব মারা যায় এই দুর্যোগে। একে বলা হয় ‘পার্মিয়ন গণবিলুপ্তি’।
এরপর আরো কিছু গণবিলুপ্তি সংগঠিত হয়েছে পৃথিবীতে যাতে প্রচুর প্রজাতির প্রাণী বিলুপ্ত হয়ে নতুন প্রজাতির প্রাণীর বিকাশ ঘটে।
পৃথিবীতে ডায়নোসরের উৎপত্তি লাভঃ
পার্মিয়ন গণবিলুপ্তির পর আরো কয়েকটি গণবিলুপ্তি কাটিয়ে উদ্ভব হয় ‘ডাইনোসর’দের। উৎপত্তির পর প্রায় ১৬ কোটি বছর পৃথিবী শাসন করে নানা জাতি-প্রজাতিতে বিভক্ত ডাইনোসরের দল। এসময় পৃথিবীতে প্রথম সৃষ্টি হয় কঠিন কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ভিদের বনভূমি।
এসময় চাঁদ সৃষ্টির প্রায় ৪২৫ কোটি বছর পর চাঁদের আকর্ষণ পৃথিবীর আহ্নিক গতি নির্দিষ্ট করে প্রায় ২৪ ঘণ্টার দিবারাত্রি নির্ধারণ করে।
ডাইনোসর যুগের শুরুতে পৃথিবীর স্থলভাগ একত্রিত অবস্থায় ছিলো। ডাইনোসর যুগের মাঝামাঝি অংশে এসে স্থলভাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতে থাকলো। স্থলভাগ সমুদ্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে কয়েকটি সুবৃহৎ দ্বীপের মত অংশ বিভক্ত হলো। আফ্রিকা থেকে দক্ষিণ আমেরিকার অংশ আলাদা হলো। মাঝখানে চলে এলো আটলান্টিক মহাসাগর। এভাবেই চলল ডাইনোসর যুগের ১৬ কোটি বছর। ডাইনোসরের যুগে ডাইনোসরের প্রতিপত্তির দাপটে অন্য কোনো বড় প্রাণীর বিকাশ হতে না পারলেও সৃষ্টি হলো নানা প্রজাতির ছোট ছোট স্তন্যপায়ী জীব। এগুলো আকারে ডাইনোসরের তুলনায় ইঁদুরের মত ছোট হওয়াতে ডাইনোসরের প্রভাব এদের উপর তেমন একটা পড়েনি। এতে এরা বিভিন্ন প্রজাতিতে বিভক্ত হয়ে বিবর্তিত হয়।
পৃথিবীতে গ্রহাণুর সংঘর্ষ এবং ডায়নোসরের বিলুপ্তিঃ
প্রায় সাড়ে ছয় কোটি বছর পূর্বে, প্রায় ৬ মাইল চওড়া একটি গ্রহাণুর সাথে পৃথিবীর সংঘর্ষ ঘটে। এতে সৃষ্ট ধুলোর মেঘ সারা পৃথিবীর আকাশে ছড়িয়ে পড়ে। সূর্যের আলো প্রবেশে বাধা সৃষ্টি হয়। পৃথিবীতে থাকা ২৩ কেজির চেয়ে বেশি ওজনের সকল জীবের বিলুপ্তি ঘটে। ডাইনোসরদের ১৬ কোটি বছরের শাসন শেষ হয় পৃথিবীর বুকে।
ডায়নোসরের বিলুপ্তি এবং ছোট প্রাণীদের বিবর্তনের মাধ্যমে বড় আকার ধারণ
পৃথিবী থেকে ডাইনোসর বিলুপ্ত হবার পর ছোট স্তন্যপায়ীরা বড় আকারে বিবর্তিত হতে বেশি সময় নেয়নি। ৫ কোটি বছর পূর্বে প্রথম বিবর্তিত হয় ‘প্রাইমেট’ যা আমাদের সরাসরি পূর্বপুরুষ। যাদের দেহগঠনের সাথে অনেকাংশেই মিলে যায় আমাদের দৈহিক গঠন। এসময় বিবর্তনের ধারায় তারা পায় পাঁচ আঙ্গুলের নমনীয় হাত যার সাহায্যে কোন কিছুকে ভালভাবে আঁকড়ে ধরা যায়, আর পায় উন্নত দৃষ্টির চোখ যা আরো বিবর্তিত হয়ে আরো প্রখর দৃষ্টিসম্পন্ন চোখের ‘প্রাইমেট’ এর উদ্ভব হয়।
প্রথম পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন!
তৃতীয় পর্ব দেখতে এখানে ক্লিক করুনঃ
এই আর্টিকেল টি সম্পূর্ণ পড়ার জন্য আপনাকে অসংখ্য ধন্যবাদ, এই আর্টিকেল যদি বুঝতে কোন অসুবিধা হয় অথবা কোনো প্রশ্ন থাকে তাহলে অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে কমেন্ট করুন, যথাক্রমে সকল কমেন্টের উত্তর দেওয়া হবে। আর নতুুন কিছু জানার থাকলে আমাদের জানান, আমরা সে-সব জানানোর চেস্টা করবো আমাদের সাথে যোগাযোগ
স্বীকারোক্তিঃ UipOka তে উপস্থাপিত সকল তথ্যই দক্ষ ও অভিজ্ঞ লোক দ্বারা ইন্টারনেট থেকে সংগ্রহ করা। যেহেতু কোন মানুষই ভুলের ঊর্দ্ধে নয় সেহেতু আমাদেরও কিছু অনিচ্ছাকৃত ভুল থাকতে পারে। সে সকল ভুলের জন্য আমরা আন্তরিকভাবে ক্ষমাপ্রার্থী।
