ভারতে আর্যদের আক্রমণ দখলদারিত্বের করুণ ইতিহাস
আজ আলোচনা করতে চলেছি হিন্দুধর্মের কথিত 'উৎসব' সম্পর্কে, যার নাম 'হোলি'।
জানেন কি, কী ছিলো এই হোলির অন্তরালের রহস্য……
একজন অনার্য ভারতীয় রাজকুমারীকে জীবন্ত পুড়িয়ে হত্যা করা উৎসবের নাম হোলী উৎসব।
হোলী উৎসবের উৎস কি তা জানা যাক--
প্রাচীন ভারতে বাংলা বাদে শক্তিশালী আরও একটি অনার্য রাজ্য ছিলো- সৌরাষ্ট্র(গুজরাট)
হিন্দুদের ধর্মগ্রন্থ ভাগবাত পুরাণ এবং নারদ সংহিতায় হোলিকা নামক অসুরের কাহিনী বর্ণিত আছে। গত পোস্টে আলোচিত হয়েছিলো আর্যরা আসলে ঠিক কাদেরকে অসুর বলে গণ্য করতো। তাই এনিয়ে কথা না বাড়াই…
ভারতে আর্যদের আক্রমণ দখলদারিত্বের করুণ ইতিহাস এবং হোলি রহস্য
প্রহ্লাদ উপখ্যান, দশকুমার চরিত, ভক্তসুমতি ও রত্নাবলী ইত্যাদি সংস্কৃত নাটকে হোলীকা অসুরের কাহিনী হয়েছে। দক্ষিন ভারত, মধ্য ভারত ও উত্তর-পূর্ব ভারতের বিস্তীর্ণ অঞ্চলের লোকগাঁথা হিসেবে যে কাহিনী বর্ণিত হয়েছে, সেখানে একে দেবতা-অসুরের লড়াইয়ের লেবাসে বস্তুতপক্ষে আর্য-অনার্যের সংঘাত হিসাবে তুলে ধরা হয়েছে।কাহিনীটির মূলভাব নিম্নরূপঃ-
প্রাচীন ভারতের মহাপরাক্রমশালী সৌরাষ্ট্রের অনার্য রাজা হিরণ্যকাশ্যপের রাজত্ব আক্রমন করলে রাজা হিরণ্যকাশ্যপ যুদ্ধে আর্যদের পরাজিত করেছিলেন। যুদ্ধে রাজা হিরণ্যকাশ্যপের ছোট ভাই হিরণ্যক্ষ কে ছলনার দ্বারা আর্য সেনাপতি হত্যা করে। এরপর আর্য সেনাপতিএকদিন গোপনে আক্রমণ করে রাজা হিরণ্যকাশ্যপের গর্ভবতী স্ত্রী কায়াধুকে অপহরণ করে নিয়ে গিয়ে সম্ভ্রমহানি করে।
কায়াধুর প্রতি অনেক অত্যাচার করে আর্যরা। আর্যদের আশ্রয়ে জন্ম হয় কায়াধুর সন্তান প্রহ্লাদের। প্রহ্লাদের পিতৃপরিচয় ভুলিয়ে দিতে জন্মের পর থেকেই আর্যরা তাদের পরিবেশ ও সংস্কৃতিতে পালন করতে থাকে প্রহ্লাদকে। তাই জন্মের পর থেকেই প্রহ্লাদকে আর্যদের ধর্মের প্রতি
যজ্ঞ, আর্য মন্ত্র ইত্যাদির প্রতি অনুরক্ত করে তোলা হয় এবং আর্যদের দেবতা বিষ্ণুর প্রতি তার গভীর ভক্তি-শ্রদ্ধা জাগিয়ে তোলা হয়। এরপর একদিন রাজা হিরণ্যকাশ্যপ আর্যদের আক্রমন করে রাজমহিষী কায়াধু ও রাজপুত্র প্রহ্লাদকে উদ্ধার করে নিয়ে আসে।
কিন্তু,, শিশু প্রহ্লাদের আর্যদের ধর্মের প্রতি ভক্তি দেখে বিচলিত হয়ে পড়েন৷
আর্য বহিরাগতরা এই সুযোগে প্রহ্লাদের সহযোগিতায় মহাশক্তিশালী মহান অনার্য রাজা হিরন্যকাশ্যপকে প্রথমে নারীর ছলার সাহায্যে হিংস্র সিংহের মুখে ফেলে নির্মমভাবে হত্যা করে আর্যরা।
ভারতে আর্যদের আক্রমণ দখলদারিত্বের করুণ ইতিহাস
পুরাণে বর্ণিত আছে- [দেবতা বিষ্ণু নাকি সিংহরূপ/নরসিংহ অবতার ধারণ করে অসুর হিরণ্যকশ্যপকে হত্যা করেছিলেন। বাস্তবতা হলো- আর্য রাজা হিরণ্যকশ্যপকে ভয়ংকর জন্তু সিংহের মুখে ঠেলে দিয়ে হত্যা করেছিল। সেটাকেই এরা কল্পনা মিশিয়ে লিখেছে- "নরসিংহ" অবতার]
অনার্য রাজপুত্র প্রহ্লাদ কে নামমাত্র সিংহাসনে বসিয়ে আর্যরা রাজকার্য পরিচালনা করতে থাকে এবং অনার্যভূমিতে আর্য সংস্কৃতি ছড়িয়ে দিতে থাকে, আর্যরাজ প্রহ্লাদের কাছ থেকে প্রতিমুহূর্তে খাদ্যশস্য, সুরা, গরু, অস্ত্র, এমনকি অনার্য যুবতী নারীদের চাপ দিয়ে আদায় করতে থাকে। সম্ভ্রমহানি করে অসংখ্য অনার্য যুবতী নারীর।
অনার্য ভূমিতে দেখা যায় আর্যদের।
"হোলীকা" ছিলেন হিরন্যকাশ্যপের বোন অর্থাৎ প্রহ্লাদের ফুফু। তিনি একদিকে যেমন বিদূষী নারী ছিলেন, অপর দিকে ছিলেন বিচক্ষণ, বুদ্ধিমতী, রাজ্য পরিচালনায় সুদক্ষ, প্রজাবৎসল, অসাধারণ যোদ্ধা রাজকন্যা ছিলেন।
হিরন্যকাশ্যপের শক্তির মূল আধারও ছিলেন তিনি এই প্রজাহিতৈষী রাজকুমারীকে প্রজারা মাতৃজ্ঞানে শ্রদ্ধা করতেন।
প্রহ্লাদের রাজ্যের এরূপ কঠিন পরিস্থিতিতে হোলীকা সর্বপ্রথমে প্রহ্লাদকে তার পূর্বের অনার্য ইতিহাস ও গৌরব গাঁথা ধীরে ধীরে স্মরণ করাতে থাকলেন…। ---
কীভাবে দেবতারা তার চাচা হিরন্যক্ষকে অন্যায় ভাবে হত্যা করেছে, কিভাবে তার গর্ভবতী মাকে আর্যরা হরন করে নিয়ে গিয়ে অত্যাচার করেছে, কীভাবে তার মনকে বিষিয়ে দিয়ে ষড়যন্ত্র করে পিতাকে হত্যা করেছে। ধীরে ধীরে প্রহ্লাদের তার জাতির প্রতি মমত্ব বাড়ে এবং আর্যদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নিতে ফুফুর কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়। অবশেষে হোলীকার সহায়তায় ও পরামর্শে রাজ্যকে সবদিক দিয়ে শক্তিশালী করে গড়ে তোলে। তারপর আর্য দখলদারদের উপঢৌকন খাদ্যশস্য, গরু, অস্ত্র, সুরা, নারী দেওয়া বন্ধ করে।আর্যরা খোঁজখবর নিয়ে জানতে পারে প্রহ্লাদের শক্তির মূল উৎস হলো হোলীকা।
হোলীকা জীবিত থাকলে প্রহ্লাদকে যুদ্ধে কোন ভাবেই পরাস্ত করা যাবে না। ফলে তারা যেকোন প্রকারে হোলীকাকে হত্যা করার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়।
অবশেষে গভীর ষড়যন্ত্রের দ্বারা বৃদ্ধা হোলীকাকে হরণ করে ফাঁকা মাঠের মাঝে একটা পর্ণ কুটিরে বন্দি করে অনাহারে রাখা হয়।দীর্ঘদিন না খেতে পেয়ে কঙ্কালসার হয়ে যায় তাঁর দেহ। অবশেষে প্রহ্লাদ জানতে পেরে সৈন্যবাহিনী নিয়ে ফুফুকে উদ্ধার করতে গেলে দেবতারা আগে থেকে জানতে পেরে পাতার কুটিরে আগুন ধরিয়ে দেয়। দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকে পাতার কুটির। আর তারই মাঝে অনাহারে ক্লিষ্ট কঙ্কালসার এক অনার্য বৃদ্ধা রাজকুমারী আগুনের লেলিহান শিখায় মৃত্যুবরণ করেন। আর হোলীকার চিতাভস্ম গায়ে মাখিয়ে বিজয় উল্লাসে মেতে ওঠে আর্যরা। পরবর্তীকালে ছাই মাখানোর পরিবর্তে গায়ে রং বা আবির মাখানোর রীতি চালু হয়।এই হলো হিন্দুদের উৎসব "হোলী"র ইতিহাস।
দুর্গাপূজা যেমন আর্য দখলদারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে প্রাণ দেয়া এক বীর অনার্য বাঙালি রাজার কাহিনী, তেমনি হোলী উৎসব এক বীরাঙ্গনা দেশপ্রেমিক অনার্য রাজকুমারীকে নির্মমভাবে হত্যার কাহিনী।
বস্তুতপক্ষে হিন্দু পুরাণে যত দেবতা-অসুরের /দেবতা-রাক্ষসের কাহিনী আছে, সবই আর্য-অনার্যের লড়াইয়ের কাহিনী। অনার্যদের প্রতাপে পরাজিত হয়ে তারা তাদেরকে আখ্যায়িত করতো অশুভ শক্তি বা অসুর হিসেবে। অনার্যদের কাছে মার খেয়েছিলো বারবার বলেই অনার্যদেরকে নাম দিয়েছিলো- "অসুর"।
এই হিরণ্যকশ্যপের রাজ্য ছিলো সৌরাষ্ট্র (গুজরাট)„ যা আর্যরা দখল করে নেয়।
রাজকন্যা হোলিকাকে কুলাঙ্গার ব্রাহ্মণরা নাম দিয়েছে "হোলিকা অসুর"।
এখন প্রশ্ন হলো- একজন বৃদ্ধা অনার্য নারীর নির্মম-নৃশংস হত্যার ঘটনা কখনো কি উৎসব হতে পারে ? এটা সমগ্র সভ্য সমাজের অপমান নয় কি ? এই উৎসবকে রাষ্ট্র কখনো স্বীকৃতি দিতে পারে ?
আর্যরা বহিরাগত, উরাল পাহাড়ের অন্ধকার গুহা থেকে এসে তারা অনার্যদের সিন্ধু সভ্যতা ধ্বংস করে ভারতকে অবৈধভাবে দখল করেছিলো ২০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে।
ভারতের মূলনিবাসী আদি ভূমিপুত্রদের তারা নাম দিয়েছিলো- শূদ্র/দলিত/চণ্ডাল। ভারতের নিজস্ব ভূমিপুত্রদের হত্যাকরেছিলো গণহারে, সম্ভ্রমহানি করেছিলো অনার্যদের।
অনার্যদের উপর আর্যদের গণহত্যা নিয়ে কথা আমাদেরকে বলতেই হবে। কারণ- আমরা বাঙ্গালী মুসলিমরা অধিকাংশই অনার্য শূদ্রদের বংশধর। ইসলাম আসার পর এই অত্যাচারিত শূদ্ররাই সবচেয়ে বেশি ইসলাম গ্রহণ করেছিলো। আমাদের অধিকাংশের পূর্বপুরুষ ছিলেন অনার্য-মূলনিবাসী, এই বাংলার আদিসন্তান যাদেরকে আর্যরা নাম দিয়েছিলো 'শূদ্র' বা কথিত নিম্নবর্ণের হিন্দু। তারাই ইসলাম গ্রহণ করে দলে দলে মুসলিম হয়েছিলেন। এছাড়া তুর্কি, পাঠান, পারসিক, আরব মুসলিম যারা এদেশে এসেছিলেন সবাই নেটিভদের বিবাহ করে বাঙ্গালী জনজাতিতে পরিণত হয়েছিলেন।
ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা কিন্তু এখনো পর্যন্ত জাতের বাইরে বিয়ে করেনা "আর্যত্ব" বজায় রাখতে!!
এই বাংলার ভূমিপুত্র আমরা বাঙ্গালী মুসলিম এবং শূদ্র-বৈশ্য-দলিত-বহুজন সম্প্রদায়,, আর্য দখলদারদের বংশধর ব্রাহ্মণ-ক্ষত্রিয়রা নয়।
তাই পূর্ব-পুরুষের উপর করা অত্যাচার নিয়ে বাঙ্গালী মুসলিমদের মুখ খুলতেই হবে।
হিন্দুরা এখনো রাজকন্যা হোলিকার মৃত্যুদিনে রং ছিটিয়ে হোলি উৎসব পালন করে থাকে। হোলি উৎসব আমাদের বাঙ্গালী মুসলিমদের পূর্ব-পুরুষের উপর আঘাত, এ আমাদের পূর্বপুরুষের অনার্যত্বে চরম আঘাত!
তাই এ নিয়ে কথা বলতে হবে… …
অনার্য-মূলনিবাসী-দলিত-বহুজন-বাঙ্গালী মুসলিমের পূর্ব-পুরুষের প্রতিনিধি হোলীকার মৃত্যুতে যে উৎসব রচনা করেছে আর্য তথা ব্রাহ্মন্যবাদীরা, সেই উৎসব-
সংস্কৃতি কোনো সভ্য সমাজে গণ্য হতে পারেনা।
নিশ্চয়ই অসভ্য জাহিলি জাতির স্থান অন্ধকারে…মুসলিম শাসকদের যারা ইনভেডর বলার দুঃসাহস দেখায় সেই মূর্খদের কে তাদের পিতৃভূমি উরাল পাহাড়ের অন্ধকার গুহায় পাঠিয়ে দিতে হবে...…
লেখক- রাজিত তাহমীদ জিত
তারিখ-৩০/০৮/২০২২
তথ্যসূত্র- (১) ভাগবৎ পুরাণ [গীতা প্রেস, দ্বাদশ সংস্করণ, পৃষ্ঠা- ১৪৫ থেকে ১৫৮ ]
(২) নারদ সংহিতা [গীতা প্রেস, নবম সংস্করণ, পৃষ্ঠা-- ২১৮ থেকে ২২৬,২৩২]
(৩) প্রহ্লাদ উপাখ্যান [বাংলাদেশ এসিয়াটিক সোসাইটি থেকে প্রকাশিত]
